অরাজনৈতিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র

একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র হলো এমন একটি দালিলিক বিধিবিধান যা সংগঠনের নাম, লক্ষ্য, সদস্যপদ, পরিচালনা পর্ষদ এবং আর্থিক লেনদেনের নিয়মাবলি নির্ধারণ করে। এটি মূলত সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনি বৈধতা (যেমন- সমাজসেবা অধিদপ্তর বা জয়েন্ট স্টক রেজিস্ট্রেশন) পাওয়ার জন্য অপরিহার্য।

অরাজনৈতিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র কেন প্রয়োজন?

যেকোনো সামাজিক বা অরাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। একটি শক্তিশালী গঠনতন্ত্র থাকলে:

  • সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিচ্যুতি ঘটে না।
  • নেতৃত্ব নির্বাচন এবং দায়িত্ব বন্টন সহজ হয়।
  • আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে।
  • সরকারি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এটি প্রধান শর্ত হিসেবে কাজ করে।

গঠনতন্ত্রের প্রধান ধারা ও উপ-ধারা (নমুনা কাঠামো)

একটি কার্যকর গঠনতন্ত্রে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকে:

ধারা ১: নাম ও প্রধান কার্যালয়

সংগঠনের একটি স্বতন্ত্র নাম থাকতে হবে যা অন্য কোনো নিবন্ধিত সংগঠনের নামের সাথে মিলবে না। এছাড়া সংগঠনের স্থায়ী বা অস্থায়ী অফিসের ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে।

ধারা ২: লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

সংগঠনটি কেন তৈরি করা হয়েছে? যেমন: শিক্ষা বিস্তার, রক্তদান, পরিবেশ রক্ষা বা দারিদ্র্য বিমোচন। এখানে অরাজনৈতিক এবং অলাভজনক হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট থাকতে হবে।

ধারা ৩: সদস্যপদ লাভের নিয়ম

কারা সদস্য হতে পারবেন? সদস্য হওয়ার যোগ্যতা, ফি এবং সদস্যপদ বাতিলের শর্তাবলি এখানে সুনির্দিষ্টভাবে থাকবে। সাধারণত ৩ ধরনের সদস্য থাকে:

  • সাধারণ সদস্য
  • আজীবন সদস্য
  • উপদেষ্টা বা সম্মানসূচক সদস্য

ধারা ৪: পরিচালনা পর্ষদ (Executive Committee)

সংগঠনটি কীভাবে পরিচালিত হবে? একটি আদর্শ কমিটি সাধারণত ৭ থেকে ২১ সদস্যের হয়। পদের বিন্যাস হতে পারে:

  • সভাপতি ও সহ-সভাপতি
  • সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
  • সাংগঠনিক সম্পাদক
  • অর্থ সম্পাদক
  • দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক

ধারা ৫: নির্বাচন ও মেয়াদকাল

কমিটি কত বছরের জন্য নির্বাচিত হবে (সাধারণত ২ বা ৩ বছর) এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া (ভোট বা সিলেকশন) কী হবে, তা এখানে উল্লেখ করতে হয়।

আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের স্বচ্ছতার প্রধান জায়গা হলো তার অর্থায়ন।

  • আয়ের উৎস: সদস্য ফি, অনুদান বা সরকারি বরাদ্দ।
  • ব্যাংক হিসাব: সাধারণত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং অর্থ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয় (যেকোনো দুজনের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা ভালো)।

সভা বা মিটিংয়ের নিয়মাবলি

সংগঠনের কার্যক্রম সচল রাখতে নিয়মিত সভা করা প্রয়োজন।

  • সাধারণ সভা: বছরে অন্তত একবার।
  • কার্যকরী কমিটির সভা: মাসে একবার বা তিন মাস অন্তর।
  • কোরাম: মোট সদস্যের কত শতাংশ উপস্থিত থাকলে সভা বৈধ হবে (সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ)।

গঠনতন্ত্র সংশোধন ও বিলুপ্তি

সময়ের প্রয়োজনে গঠনতন্ত্রের কোনো ধারা পরিবর্তন করতে হলে সাধারণ সভায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন হয়। এছাড়া সংগঠনটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কোথায় যাবে, তা উল্লেখ থাকা জরুরি।

সাধারণ জিজ্ঞাস্য

প্রশ্ন ১: অরাজনৈতিক সংগঠনের নিবন্ধন কোথায় করতে হয়? উত্তর: বাংলাদেশে সাধারণত সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বা স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশের অধীনে নিবন্ধন করা হয়।

প্রশ্ন ২: গঠনতন্ত্র কি হাতে লিখে জমা দেয়া যায়? উত্তর: না, বর্তমানে সরকারি নিবন্ধনের জন্য এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে কম্পিউটার কম্পোজ করে হার্ডকপি জমা দিতে হয়।

প্রশ্ন ৩: রাজনৈতিক ব্যক্তি কি অরাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হতে পারেন? উত্তর: হ্যাঁ পারেন, তবে সংগঠনের ভেতরে তিনি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না এবং সংগঠনের নামে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না।

উপসংহার

একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর অরাজনৈতিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র সংগঠনের প্রাণ। এটি তৈরিতে তাড়াহুড়ো না করে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া উচিত। মনে রাখবেন, নিয়ম যত পরিষ্কার হবে, সংগঠনের কাজ তত গতিশীল হবে।

Leave a Comment