সামাজিক সংগঠনের নিয়ম নীতি

একটি সফল সামাজিক সংগঠন পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নীতি এবং সুগঠিত গঠনতন্ত্র অপরিহার্য। বাংলাদেশে যেকোনো সামাজিক সংগঠন আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য একটি কার্যকর গঠনতন্ত্র তৈরি করা প্রথম ধাপ।

সামাজিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সামাজিক সংগঠনের গঠনতন্ত্র হলো সংগঠনের সর্বোচ্চ দলিল যা সংগঠনের কাঠামো, উদ্দেশ্য, পরিচালনা পদ্ধতি এবং সদস্যদের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে। এটি সংগঠনের আইনগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জন্য অত্যাবশ্যক।

গঠনতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে সংগঠন পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং আইনি সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গঠনতন্ত্রের মূল নীতিমালা যা অনুসরণ করতে হবে

১. লক্ষ্যের নীতি (Principle of Goals)

সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ:

  • শিক্ষা সম্প্রসারণ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান
  • স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ ও চিকিৎসা সহায়তা
  • পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধি
  • মহিলা ও শিশু কল্যাণ কার্যক্রম পরিচালনা

প্রতিটি কার্যক্রম অবশ্যই ঘোষিত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

২. কাঠামোর নীতি (Principle of Structure)

একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে:

  • স্তর বিন্যাস সুস্পষ্ট থাকবে (সাধারণ সভা → কার্যনির্বাহী পরিষদ → উপ-কমিটি)
  • কর্তৃত্বের রেখা (Authority Line) নির্ধারিত থাকবে
  • বিভাগীয় দায়িত্ব ও কার্যপরিধি পরিষ্কার থাকবে

৩. দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের নীতি

প্রতিটি পদের কাজ, দায়িত্ব এবং ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত থাকতে হবে। এতে দায়িত্বের ওভারল্যাপিং বা দ্বন্দ্ব এড়ানো সম্ভব হয়।

৪. স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক নীতি

সংগঠনকে অবশ্যই:

  • স্বেচ্ছাসেবী এবং অরাজনৈতিক হতে হবে
  • অলাভজনক ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে
  • কোনো মুনাফা সদস্যদের মধ্যে বন্টন করা যাবে না
  • উদ্বৃত্ত অর্থ শুধুমাত্র সংগঠনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যয় করতে হবে

সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির কাঠামো ও পদবিন্যাস

একটি কার্যকর সামাজিক সংগঠনে সাধারণত নিম্নলিখিত পদগুলো থাকে:

সভাপতি (President/Chairperson)

প্রধান দায়িত্ব:

  • সংগঠনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করা
  • সকল সভা পরিচালনা ও তদারকি করা
  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদন প্রদান
  • সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করা

সহ-সভাপতি (Vice President)

প্রধান দায়িত্ব:

  • সভাপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন
  • বিশেষ প্রকল্প তদারকি করা
  • সভাপতিকে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান

সাধারণ সম্পাদক (General Secretary)

প্রধান দায়িত্ব:

  • প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন
  • চিঠিপত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা
  • সভার কার্যবিবরণী সংরক্ষণ
  • দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা

কোষাধ্যক্ষ (Treasurer)

প্রধান দায়িত্ব:

  • তহবিল সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা
  • আয়-ব্যয়ের হিসাব রক্ষণ
  • আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা
  • আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা

সাংগঠনিক সম্পাদক (Organizing Secretary)

প্রধান দায়িত্ব:

  • নতুন সদস্য সংগ্রহ
  • সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি
  • অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা
  • সদস্যদের রেজিস্টার ও রেকর্ড রক্ষণ

কার্যকরী সদস্যবৃন্দ (Executive Members)

কার্যকরী সদস্যরা বিভিন্ন কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন এবং নির্বাহী পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।

সদস্যপদের নিয়মকানুন ও যোগ্যতা

সদস্য হওয়ার যোগ্যতা

একজন ব্যক্তি সংগঠনের সদস্য হতে হলে নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে:

  1. বয়স: সাধারণত ১৮ বছর বা তার বেশি (সংগঠন ভেদে ভিন্ন হতে পারে)
  2. নৈতিক চরিত্র: উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী এবং আদালত কর্তৃক কোনো ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত নয়
  3. আদর্শগত সমর্থন: সংগঠনের আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি অনুগত
  4. আর্থিক বাধ্যবাধকতা: নির্ধারিত ভর্তি ফি ও মাসিক/বার্ষিক চাঁদা প্রদান
  5. আবেদন অনুমোদন: কার্যনির্বাহী কমিটি কর্তৃক সদস্যপদ অনুমোদিত

সদস্যের শ্রেণীবিভাগ

বেশিরভাগ সামাজিক সংগঠনে চার ধরনের সদস্যপদ থাকে:

১. সাধারণ সদস্য (General Members)

নিয়মিত ভোটাধিকার ও সকল সুবিধা ভোগকারী সদস্য যারা মাসিক/বার্ষিক চাঁদা প্রদান করেন।

২. সহযোগী সদস্য (Associate Members)

সীমিত অধিকার সম্পন্ন সদস্য, যেমন প্রবাসী সদস্য বা স্থানীয়ভাবে অনুপস্থিত সদস্য।

৩. সম্মানিত সদস্য (Honorary Members)

বিশেষ অবদানের জন্য সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রাপ্ত ব্যক্তি, যাদের সাধারণত চাঁদা প্রদান করতে হয় না।

৪. আজীবন সদস্য (Life Members)

একবার নির্ধারিত ফি প্রদান করে আজীবনের জন্য সদস্যপদ লাভকারী ব্যক্তি।

সদস্যপদ বাতিল বা স্থগিতের কারণ

নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে সদস্যপদ বাতিল বা স্থগিত করা যেতে পারে:

  • গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কোনো কাজ করলে
  • সংগঠনের আর্থিক ক্ষতি সাধন করলে
  • স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত হলে
  • গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া পরপর তিন বা ততোধিক সভায় অনুপস্থিত থাকলে
  • নির্ধারিত সময়ে চাঁদা পরিশোধ না করলে
  • স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে

বাংলাদেশে সামাজিক সংগঠন নিবন্ধনের আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে সামাজিক সংগঠন পরিচালনার জন্য আইনগত বৈধতা পেতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনের জন্য প্রযোজ্য প্রধান আইনগুলো:

১. স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থা নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২২

এটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করে। এই আইনের অধীনে নিবন্ধন পেতে:

  • সংগঠনের স্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে
  • গঠনতন্ত্র জমা দিতে হবে
  • কার্যনির্বাহী কমিটির তালিকা প্রদান করতে হবে

২. সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০

সমিতি হিসেবে নিবন্ধনের জন্য এই আইন প্রযোজ্য। এটি সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী নিবন্ধন পদ্ধতি। রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (RJSC)-এ আবেদন করতে হয়।

৩. ট্রাস্ট আইন, ১৮৮২

ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধন করতে চাইলে এই আইনের অধীনে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

৪. ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট

বিদেশী অনুদান গ্রহণ করতে চাইলে এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো (NGOAB) থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

সংগঠন নিবন্ধনের ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া

ধাপ ১: লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ

প্রথমেই সংগঠনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য লিখিত আকারে প্রস্তুত করুন। এটি SMART (Specific, Measurable, Achievable, Relevant, Time-bound) পদ্ধতিতে লেখা উত্তম।

ধাপ ২: পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরি

গঠনতন্ত্রে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে:

  • সংগঠনের নাম ও ঠিকানা
  • লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • সদস্যপদের নিয়মাবলী
  • কার্যনির্বাহী কমিটির গঠন ও নির্বাচন পদ্ধতি
  • সভা আহবান ও পরিচালনার নিয়ম
  • তহবিল ব্যবস্থাপনা
  • গঠনতন্ত্র সংশোধন পদ্ধতি
  • সংগঠন বিলুপ্তির নিয়ম

ধাপ ৩: প্রাথমিক কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন

কমপক্ষে ৭-১৫ জন সদস্য নিয়ে একটি প্রাথমিক কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করুন এবং সভাপতি, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ অন্যান্য পদে ব্যক্তি নির্বাচন করুন।

ধাপ ৪: প্রয়োজনীয় দলিল সংগ্রহ

নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

  • পূরণকৃত আবেদনপত্র
  • গঠনতন্ত্রের কপি (৩ কপি)
  • কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের তালিকা ও স্বাক্ষর
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি
  • সংগঠনের কার্যালয়ের ঠিকানার প্রমাণপত্র
  • নির্ধারিত ফি প্রদানের রসিদ

ধাপ ৫: উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন

সংগঠনের ধরন অনুযায়ী সমাজসেবা অধিদপ্তর অথবা RJSC-তে আবেদন জমা দিন।

ধাপ ৬: যাচাইকরণ ও অনুমোদন

কর্তৃপক্ষ দলিলপত্র যাচাই করে ১৫-৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সনদ প্রদান করবে।

গঠনতন্ত্র তৈরিতে সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন

১. অস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

অনেক সংগঠন খুব সাধারণ বা অস্পষ্ট লক্ষ্য লিখে ফেলে, যা পরবর্তীতে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা সৃষ্টি করে।

২. দায়িত্ব বন্টনে অস্পষ্টতা

প্রতিটি পদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না করলে কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।

৩. আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম না রাখা

গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে তহবিল সংগ্রহ, ব্যয়, নিরীক্ষা এবং আর্থিক প্রতিবেদনের নিয়ম উল্লেখ করা আবশ্যক।

৪. সংশোধন পদ্ধতি নির্ধারণ না করা

গঠনতন্ত্র সংশোধনের পদ্ধতি না থাকলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা কঠিন হয়।

কার্যকর সংগঠন পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত টিপস

নিয়মিত সভা অনুষ্ঠান করুন

মাসিক কার্যনির্বাহী সভা এবং বার্ষিক সাধারণ সভা নিয়মিত আয়োজন করুন। সকল সভার কার্যবিবরণী লিখিত রাখুন।

স্বচ্ছতা বজায় রাখুন

আর্থিক লেনদেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন।

সদস্যদের সম্পৃক্ত করুন

সদস্যদের মতামত গ্রহণ এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন।

ডিজিটাল রেকর্ড রাখুন

সকল দলিলপত্র, হিসাব এবং কার্যবিবরণী ডিজিটাল ফর্ম্যাটে সংরক্ষণ করুন।

উপসংহার

একটি সফল সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নীতি এবং কার্যকর গঠনতন্ত্র অপরিহার্য। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী নিবন্ধন সম্পন্ন করে, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা বজায় রেখে এবং সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আপনার সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।

আপনার সংগঠনের ধরন ও লক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনুন এবং আইনি পরামর্শ গ্রহণ করুন। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আপনার সংগঠন সমাজের জন্য অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top