সভার কার্যবিবরণী হলো একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত দলিল যা সভার আলোচনা, সিদ্ধান্ত এবং কার্যক্রমের নথি হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠনে এটি একটি অপরিহার্য দলিল যা ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সভার কার্যবিবরণী লেখার আগে যা জানা জরুরি
একটি সঠিক কার্যবিবরণী লিখতে হলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট এবং কাঠামো মেনে চলতে হয়। এতে সভার সকল তথ্য সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং পরবর্তীতে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে।
কার্যবিবরণীর মূল উপাদান: ৭টি অপরিহার্য অংশ
১. স্থান
সভা যে স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে তার পূর্ণ নাম উল্লেখ করতে হবে।
উদাহরণ:
- বিভাগীয় কার্যালয়, বাংলা বিভাগ
- সভাকক্ষ নং ৩, প্রশাসনিক ভবন
২. তারিখ
সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার সঠিক তারিখ খ্রিস্টাব্দ অনুযায়ী লিখতে হবে।
ফরম্যাট: ২৯/০১/২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
৩. সময়
সভা শুরু হওয়ার সময় ঘণ্টা ও মিনিটসহ উল্লেখ করতে হবে।
উদাহরণ:
- দুপুর ১:০০ ঘটিকা
- সকাল ১০:৩০ ঘটিকা
৪. সভাপতি
সভার সভাপতির পদবি এবং প্রতিষ্ঠানের নাম স্পষ্টভাবে লিখতে হবে।
উদাহরণ: বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ
৫. সভায় উপস্থিত সদস্যবৃন্দের তালিকা
সভায় উপস্থিত প্রতিটি সদস্যের নাম, পদবি এবং স্বাক্ষরের জন্য স্থান রাখতে হবে।
ফরম্যাট:
১. জনাব মো. সোহেল, প্রভাষক (বাংলা) .................... স্বাক্ষর
২. জনাব ........................, পদবি ..................., স্বাক্ষর
৩. জনাব ........................, পদবি ..................., স্বাক্ষর
কার্যবিবরণীর মূল অংশ কীভাবে লিখবেন
সভার বিবরণী লেখার সঠিক পদ্ধতি
কার্যবিবরণীর মূল অংশ শুরু করতে হয় “অদ্য” শব্দ দিয়ে এবং এতে কোনো শিরোনাম ব্যবহার করা যাবে না।
স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট:
“অদ্য [তারিখ] খ্রিস্টাব্দ [সকাল/দুপুর] [সময়] ঘটিকায় [স্থানের নাম]-এ এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন [সভাপতির পদবি ও নাম]। সভাপতি মহোদয় উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে সভার কার্যক্রম শুরু করেন। উক্ত সভায় [বিষয়] বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়।”
আলোচনা ও সিদ্ধান্তের টেবিল তৈরি
সভার আলোচিত বিষয় এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য টেবিল ফরম্যাট ব্যবহার করতে হবে।
টেবিল কাঠামো:
| ক্রমিক নং | আলোচ্যসূচি | গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ |
|---|---|---|
| ০১ | [বিষয়] | [সিদ্ধান্ত] সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। |
| ০২ | [বিষয়] | [সিদ্ধান্ত] সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। |
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- প্রতিটি সিদ্ধান্তের শেষে “সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো” বাক্যাংশ ব্যবহার করতে হবে
- ক্রমিক নম্বর ০১, ০২, ০৩ এভাবে লিখতে হবে
সভার সমাপ্তি লেখার নিয়ম
সভার কার্যবিবরণীর শেষ অংশ সবসময় একই বাক্য দিয়ে লিখতে হয়:
স্ট্যান্ডার্ড সমাপ্তি:
“আর কোনো আলোচনার বিষয় না থাকায় সভাপতি মহোদয় সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।”
এরপর সভাপতির তথ্য সংযোজন:
সভাপতি
[পদবি]
[প্রতিষ্ঠানের নাম]
[ঠিকানা]
সম্পূর্ণ নমুনা কার্যবিবরণী: পিঠা উৎসব ২০২৫
মৌলিক তথ্য
স্থান: বিভাগীয় কার্যালয়, বাংলা বিভাগ
তারিখ: ২৯/০১/২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
সময়: দুপুর ১:০০ ঘটিকা
সভাপতি: বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ
সভায় উপস্থিত সদস্যবৃন্দ
১. জনাব মো. সোহেল, প্রভাষক (বাংলা) ……………….. স্বাক্ষর
২. জনাব ……………………, পদবি ………………., স্বাক্ষর
৩. জনাব ……………………, পদবি ………………., স্বাক্ষর
সভার বিবরণী
অদ্য ২৯/০১/২০২৫ খ্রিস্টাব্দ দুপুর ১:০০ ঘটিকায় বাংলা বিভাগীয় কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় প্রধান জনাব ‘ক’। সভাপতি মহোদয় উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে সভার কার্যক্রম শুরু করেন। উক্ত সভায় ‘পিঠা উৎসব-২০২৫’ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়।
আলোচনা ও গৃহীত সিদ্ধান্ত
| ক্রমিক নং | আলোচ্যসূচি | গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ |
|---|---|---|
| ০১ | তারিখ ও অতিথি নির্ধারণ | আগামী [তারিখ] তারিখ ধার্য করে প্রধান অতিথি হিসাবে সংস্কৃতিমনা ‘গ’ কে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। |
| ০২ | স্টল সজ্জা এবং সম্ভাব্য ব্যয় | প্রতিটি বর্ষের জন্য একটি করে স্টল বরাদ্দ রাখা এবং তার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় [টাকার অঙ্ক]-এর মধ্যে করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। |
আর কোনো আলোচনার বিষয় না থাকায় সভাপতি মহোদয় সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সভাপতি
বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ
………………. কলেজ, নাটোর
কার্যবিবরণী লেখার সময় যে ভুলগুলো এড়াতে হবে
১. শিরোনাম ব্যবহার না করা
কার্যবিবরণীর মূল অংশে “শুভেচ্ছা জ্ঞাপন” বা অন্য কোনো শিরোনাম লেখা যাবে না।
২. তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করা
- তারিখ, সময়, স্থান সঠিকভাবে লিখতে হবে
- সকল উপস্থিত সদস্যের নাম ও পদবি নির্ভুলভাবে উল্লেখ করতে হবে
৩. ফরম্যাট মেনে চলা
- নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করতে হবে
- “অদ্য” দিয়ে বিবরণী শুরু করতে হবে
৪. স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার
- সহজ, সরল বাংলায় লিখতে হবে
- অপ্রয়োজনীয় বাক্য এড়িয়ে চলতে হবে
বিভিন্ন ধরনের সভার কার্যবিবরণী
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভা
- পরীক্ষা সংক্রান্ত সভা
- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সভা
- বিভাগীয় সভা
২. অফিসিয়াল সভা
- প্রশাসনিক সভা
- বাজেট সভা
- পরিকল্পনা সভা
৩. সংগঠনের সভা
- বার্ষিক সাধারণ সভা
- কার্যনির্বাহী কমিটির সভা
- জরুরি সভা
কার্যবিবরণী সংরক্ষণ ও ব্যবহার
সংরক্ষণের নিয়ম:
- প্রতিটি কার্যবিবরণী নথিভুক্ত করতে হবে
- ক্রমিক নম্বর দিয়ে সাজিয়ে রাখতে হবে
- ডিজিটাল এবং হার্ড কপি দুটোই রাখা উচিত
ব্যবহারের ক্ষেত্র:
- ভবিষ্যত রেফারেন্স হিসেবে
- সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রমাণ হিসেবে
- আইনগত দলিল হিসেবে
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: কার্যবিবরণীতে কি ব্যক্তিগত মতামত লেখা যায়?
উত্তর: না, কার্যবিবরণীতে শুধুমাত্র সভায় আলোচিত বিষয় এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত লিখতে হবে।
প্রশ্ন: সভার কতদিনের মধ্যে কার্যবিবরণী তৈরি করতে হয়?
উত্তর: সভা শেষ হওয়ার ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কার্যবিবরণী তৈরি করা উচিত।
প্রশ্ন: কার্যবিবরণীতে কতটুকু বিস্তারিত লিখতে হবে?
উত্তর: সংক্ষিপ্ত কিন্তু সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সমৃদ্ধ হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত এড়িয়ে চলতে হবে।
উপসংহার
একটি সঠিক এবং কার্যকর সভার কার্যবিবরণী লিখতে হলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে চলা, স্পষ্ট ভাষা ব্যবহার এবং সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করা অপরিহার্য। এই নিয়মগুলো অনুসরণ করলে যেকোনো ধরনের সভার পেশাদার মানের কার্যবিবরণী তৈরি করা সম্ভব।
অফিসিয়াল কাজে দক্ষতা অর্জনের জন্য সভার কার্যবিবরণী লেখার এই পদ্ধতি আয়ত্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই দক্ষতা আরও শাণিত করা যায়।
