যেকোনো ধরনের সংগঠন তা সামাজিক হোক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা অন্য কিছু সঠিকভাবে চলার জন্য তার একটি কাজের কাঠামো দরকার হয়। এই কাঠামোর কেন্দ্রে থাকে কার্যকরী কমিটি (Executive Committee)। আর এই কমিটির মস্তিষ্ক ও হাত-পা হিসেবে কাজ করেন এর কার্যকরী সদস্যরা (Executive Members)।
সহজ কথায়, কার্যকরী সদস্যের প্রধান কাজ হলো সংগঠনের নিয়ম-কানুন ঠিক করা, জরুরি সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া এবং সেই কাজগুলো ঠিকমতো বাস্তবে হচ্ছে কিনা তা দেখাশোনা করা। তাঁরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে পুরো সংগঠনের কাজ পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখেন।
কার্যকরী সদস্য মানে কী?
একটি সংগঠনের সব সাধারণ সদস্যের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভোটে নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে যে কমিটি বা পরিষদ তৈরি হয়, তাকে কার্যকরী কমিটি বা নির্বাহী পরিষদ বলে। এই কমিটির প্রত্যেক সদস্যই একজন কার্যকরী সদস্য।
তাঁরা সাধারণ সদস্যদের হয়ে কথা বলেন এবং সংগঠনের সব ক্ষমতা এই কমিটির হাতেই থাকে। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ (হিসাবরক্ষক) বা অন্য পদাধিকারীরাও এই কমিটিরই অংশ। তবে যে সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর (যেমন: দপ্তর সম্পাদক বা প্রচার সম্পাদক) দেওয়া হয় না, তাঁরা শুধুই “কার্যকরী সদস্য” হিসেবে পরিচিত হন।
কার্যকরী সদস্যের প্রধান কাজ ও দায়িত্বগুলো
পদের নাম শুধু “সদস্য” হলেও তাঁদের দায়িত্ব অনেক বড়। কার্যকরী সদস্যের মূল কাজগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. নিয়ম-কানুন ও পরিকল্পনা ঠিক করা
- সংগঠনের দিকনির্দেশনা: সংগঠনটি ভবিষ্যতে কী করতে চায় (বড় লক্ষ্য) এবং আপাতত কী কী কাজ করা দরকার, তা ঠিক করা।
- পরিকল্পনা তৈরি: লক্ষ্য পূরণ করতে সারা বছর কী কী কাজ করা হবে এবং তার জন্য কত টাকা বাজেট হবে, সেই পরিকল্পনা বানাতে সাহায্য করা।
- নতুন বিধি তৈরি: সংগঠনের গঠনতন্ত্রের (Constitution) ভিত্তিতে নতুন নিয়ম তৈরি করা বা পুরোনো নিয়মে বদল আনা।
২. জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া
- কমিটির সভায় থাকা: কার্যকরী কমিটির প্রতিটি মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা তাঁদের জন্য বাধ্যতামূলক।
- ভোট দেওয়া: মিটিংয়ে ওঠা যেকোনো বিষয়ে আলোচনা করা এবং নিজের মতামত ও ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা। সংগঠনের সব জরুরি সিদ্ধান্ত এই মিটিংয়েই নেওয়া হয়।
- অনুমতি দেওয়া: সংগঠনের বড় কোনো খরচ, নতুন কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি শুরু করার জন্য অনুমতি দেওয়া।
৩. কাজগুলো দেখাশোনা ও বাস্তবায়ন
- কাজ পর্যবেক্ষণ: সংগঠনের প্রতিদিনের কাজ, চলমান প্রকল্প বা কর্মসূচিগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা তা খেয়াল রাখা।
- জবাবদিহি নিশ্চিত করা: সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাজের পর্যালোচনা করা এবং সংগঠনের সব কাজ যেন নিয়ম মেনে চলে তা নিশ্চিত করা।
- টাকা-পয়সার হিসাব দেখা: সংগঠনের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কোষাধ্যক্ষের কাজের তদারকি করা এবং বাজেট বাৎসরিক নিরীক্ষায় (Audit) ভূমিকা রাখা।
৪. ছোট কমিটির কাজ সামলানো
- বড় কাজগুলো (যেমন: অনুষ্ঠান করা, টাকা তোলা বা নতুন সদস্য সংগ্রহ) দ্রুত করার জন্য কার্যকরী কমিটি প্রায়ই ছোট ছোট দল বা উপ-কমিটি (Sub-committee) তৈরি করে।
- কার্যকরী সদস্যদের সাধারণত এক বা একাধিক উপ-কমিটির প্রধান, সমন্বয়ক বা সদস্য হিসেবে মূল দায়িত্ব পালন করতে হয়।
৫. সবার কথা তুলে ধরা ও বাইরের সাথে যোগাযোগ
- সদস্যদের মুখপাত্র: সাধারণ সদস্যদের কোনো কথা, অভিযোগ বা ভালো পরামর্শ থাকলে তা কার্যকরী কমিটির মিটিংয়ে তুলে ধরা। তাঁরা সাধারণ সদস্য এবং নেতাদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন।
- বাইরের প্রতিনিধিত্ব: দরকার হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে অন্য কোনো সংস্থা, সরকারি অফিস বা মিডিয়ার সামনে সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলা।
কার্যকরী সদস্য ও সাধারণ সদস্যের মধ্যে সহজ পার্থক্য
এই দুটি পদের মধ্যে আসল ফারাক বোঝা খুব দরকারি:
| বৈশিষ্ট্য | কার্যকরী সদস্য | সাধারণ সদস্য |
| ভূমিকা | খুব সক্রিয়। সংগঠনের আসল পরিচালক। | সাধারণত ততটা সক্রিয় নয়। সংগঠনটি যাদের নিয়ে চলে। |
| ক্ষমতা | সংগঠনের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। | সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই, তবে মতামত দিতে পারে। |
| দায়িত্ব | সংগঠন চালানো ও কাজ দেখার জন্য দায়ী। | সাধারণত আলাদা কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব থাকে না। |
| অধিকার | কার্যকরী কমিটির সভায় ভোট দেওয়া। | শুধু বার্ষিক সাধারণ সভায় (AGM) ও নেতা নির্বাচনে ভোট দেওয়া। |
| সংখ্যা | কম সংখ্যক (যেমন: ২১ জন বা ৫১ জন)। | সাধারণত অনেক বেশি বা অসীম। |
উপসংহার
কার্যকরী সদস্য শুধু একটি নাম নয়, এটি সংগঠনের সাফল্যের জন্য খুব জরুরি একটি পদ। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিশ্বস্ততার সাথে কাজ দেখার ওপরই সংগঠনের উন্নতি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। কার্যকরী সদস্যরা সম্মিলিতভাবে সংগঠনের “মস্তিষ্ক” বা মূল চালক হিসেবে কাজ করেন, যা পুরো সংস্থাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
