কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড হলেন একজন দপ্তর সম্পাদক। যদি আপনি জানতে চান দপ্তর সম্পাদকের কাজ কি, তবে এক কথায় এর উত্তর হলো: সংগঠনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা, রেকর্ড সংরক্ষণ, সভার নোটিশ প্রদান এবং প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি ও প্রচার করাই হলো দপ্তর সম্পাদকের মূল কাজ।
একজন দপ্তর সম্পাদক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং বাইরের দুনিয়ার সাথে (বিশেষ করে মিডিয়ার সাথে) যোগাযোগ স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। নিচে এই পদের দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দপ্তর সম্পাদকের প্রধান কাজগুলো কি কি?
একজন দপ্তর সম্পাদকের কাজকে আমরা প্রধানত ৩টি ভাগে ভাগ করতে পারি: প্রশাসনিক কাজ, যোগাযোগ রক্ষা এবং রেকর্ড সংরক্ষণ। নিচে পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা
সংগঠনের অফিসের সার্বিক দেখাশোনা করা দপ্তর সম্পাদকের প্রাথমিক দায়িত্ব।
- অফিস পরিচালনা: সংগঠনের কার্যালয় বা অফিস নিয়মিত খোলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করা।
- সম্পদ ব্যবস্থাপনা: অফিসের প্রয়োজনীয় স্টেশনারি (কলম, কাগজ, ফাইল) এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রীর হিসাব রাখা।
- কর্মচারী তদারকি: অফিসে কোনো পিয়ন বা কেয়ারটেকার থাকলে তাদের কাজের তদারকি করা।
২. নোটিশ ও যোগাযোগ (Communication)
দপ্তর সম্পাদক সংগঠনের “কমিউনিকেশন হাব” হিসেবে কাজ করেন।
- সভার নোটিশ প্রদান: সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশক্রমে কার্যকরী কমিটির সভা বা সাধারণ সভার নোটিশ প্রস্তুত করা এবং সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
- চিঠিপত্র গ্রহণ ও প্রেরণ: সংগঠনের নামে আসা যেকোনো চিঠি গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনীয় উত্তর পাঠানো।
- প্রেস রিলিজ তৈরি: সংগঠনের যেকোনো কর্মসূচির পর তা সংবাদমাধ্যমে প্রচারের জন্য প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ড্রাফট করা এবং স্বাক্ষরসহ মিডিয়াতে পাঠানো। এটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
৩. তথ্য ও রেকর্ড সংরক্ষণ (Documentation)
একটি সংগঠনের ইতিহাস এবং বর্তমান কার্যক্রমের সাক্ষী হলো তার নথিপত্র।
- সদস্য তালিকা হালনাগাদ: সংগঠনের সকল সদস্যের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ একটি আপডেটেড ডাটাবেস বা রেজিস্টার মেইনটেইন করা।
- রেজুলেশন বুক: প্রতিটি মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত বা রেজুলেশন বইয়ে লিপিবদ্ধ করা এবং সংরক্ষণ করা।
- আর্কাইভ: পুরনো চিঠি, পত্রিকার কাটিং, এবং প্রকাশনাগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ফাইলে সংরক্ষণ করা।
একজন সফল দপ্তর সম্পাদকের যোগ্যতা ও দক্ষতা
কেবল পদ থাকলেই হয় না, এই দায়িত্ব পালনের জন্য কিছু বিশেষ গুণাবলী থাকা জরুরি:
- ড্রাফটিং বা লেখার দক্ষতা: প্রেস রিলিজ বা চিঠি লেখার জন্য শুদ্ধ ভাষা ও বানান জানা আবশ্যক। বিশেষ করে বাংলায় প্রাঞ্জল ভাষায় বিজ্ঞপ্তি লেখার দক্ষতা থাকতে হবে।
- আইটি জ্ঞান: বর্তমান যুগে কম্পিউটার, ইমেইল, গুগল ডকস এবং সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালনার জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক।
- ধৈর্য ও সময়ানুবর্তিতা: অফিসের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ধৈর্যের সাথে দেখা এবং মিটিংয়ের সময় সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকা।
- গোপনীয়তা রক্ষা: সংগঠনের অনেক স্পর্শকাতর তথ্য বা নথিপত্র দপ্তর সম্পাদকের কাছে থাকে, যা গোপন রাখা তার নৈতিক দায়িত্ব।
দপ্তর সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে পার্থক্য কি?
অনেকেই এই দুটি পদের কাজ গুলিয়ে ফেলেন। গুগল সার্চে এটি একটি জনপ্রিয় প্রশ্ন।
| বিষয় | সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) | দপ্তর সম্পাদক (Office Secretary) |
| মূল কাজ | সংগঠনের নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া। | সেই নীতি বাস্তবায়নে দাপ্তরিক সহায়তা ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া। |
| ক্ষমতা | সংগঠনের প্রধান নির্বাহী (সিইও-র মতো)। | অফিসের প্রশাসনিক প্রধান (অফিস ম্যানেজারের মতো)। |
| স্বাক্ষর | নীতিগত সব সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেন। | দাপ্তরিক নোটিশ ও প্রেস রিলিজে স্বাক্ষর করেন। |
সহজ কথায়: সাধারণ সম্পাদক হলেন ইঞ্জিনের মতো, যিনি সংগঠনকে এগিয়ে নেন। আর দপ্তর সম্পাদক হলেন সেই ইঞ্জিনের মেইনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ার, যিনি নিশ্চিত করেন সব পার্টস ঠিকমতো কাজ করছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দপ্তর সম্পাদক কি নিজের ইচ্ছায় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
না, দপ্তর সম্পাদক সাধারণত সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনার বাইরে নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তিনি মূলত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দাপ্তরিক কাজগুলো করেন।
প্রেস রিলিজে কি দপ্তর সম্পাদকের স্বাক্ষর থাকে?
হ্যাঁ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলে প্রেস রিলিজে সাধারণত দপ্তর সম্পাদক বা উপ-দপ্তর সম্পাদকের স্বাক্ষর থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকও স্বাক্ষর করতে পারেন।
দপ্তর সম্পাদকের কি কোনো উপ-কমিটি থাকে?
বড় সংগঠনগুলোতে কাজের সুবিধার্থে দপ্তর সম্পাদকের অধীনে উপ-দপ্তর সম্পাদক বা সহ-সম্পাদক থাকতে পারেন, যারা তাকে কাজে সহায়তা করেন।
শেষকথা
পরিশেষে বলা যায়, দপ্তর সম্পাদকের কাজ কেবল ফাইলের ধুলো ঝাড়া নয়, বরং সংগঠনের হৃৎস্পন্দন সচল রাখা। একজন দক্ষ দপ্তর সম্পাদক ছাড়া সংগঠনের কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। আপনি যদি এই পদে দায়িত্ব পালন করতে চান বা কাউকে নিয়োগ দিতে চান, তবে ওপরের দক্ষতাগুলো (বিশেষ করে ড্রাফটিং ও আইটি স্কিল) আছে কি না, তা যাচাই করে নিন।
আমি মারুফ, গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্র্যান্ডিং এবং কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করছি। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি কিভাবে একটি ছোট স্লোগান একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।