আপনি কি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা ক্লাব শুরু করার কথা ভাবছেন? সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে একটি সুসংগঠিত দল অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশে একটি সংগঠন পরিচালনা করতে হলে সরকারি আইন এবং নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিবন্ধন পদ্ধতি, গঠনতন্ত্র এবং পরিচালনার নিয়মাবলী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মূল নিয়মাবলী কী?
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মূলত অলাভজনক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। এর মূল ভিত্তি হলো একটি অনুমোদিত গঠনতন্ত্র। বাংলাদেশে সমাজসেবা অধিদপ্তর বা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে কাজ করা যায়। প্রধান নিয়মাবলীর মধ্যে রয়েছে একটি কার্যকরী কমিটি গঠন, স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব রাখা এবং প্রতি বছর বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) আয়োজন করা।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে কোনো সামাজিক সংগঠনকে আইনি বৈধতা দিতে হলে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিবন্ধন নিতে হয়।
- সমাজসেবা অধিদপ্তর: এটি সবচেয়ে সাধারণ মাধ্যম (১৯৬১ সালের স্বেচ্ছামূলক সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী)।
- যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর: যদি সংগঠনের কাজ প্রধানত যুবকদের নিয়ে হয়।
- এনজিও বিষয়ক ব্যুরো: যদি বিদেশ থেকে অনুদান বা ফান্ড সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকে।
নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
১. প্রস্তাবিত নাম (যা অন্য কোনো সংগঠনের সাথে মিলবে না)।
২. সংগঠনের গঠনতন্ত্রের কপি।
৩. কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি।
৪. অফিস ভাড়ার চুক্তিপত্র বা মালিকানার প্রমাণ।
৫. নামজারি ও ট্রেড লাইসেন্স (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র তৈরির নিয়ম
গঠনতন্ত্র হলো একটি সংগঠনের সংবিধান। এতে সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং পরিচালনার নিয়ম লেখা থাকে। একটি আদর্শ গঠনতন্ত্রে নিচের বিষয়গুলো থাকা জরুরি:
- সংগঠনের নাম ও ঠিকানা: প্রধান কার্যালয় কোথায় হবে।
- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: সংগঠনটি কেন তৈরি করা হয়েছে (যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিবেশ রক্ষা)।
- সদস্যপদ: কে সদস্য হতে পারবেন এবং সদস্যপদ বাতিলের নিয়ম।
- কমিটির কাঠামো: সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ অন্যান্য পদের দায়িত্ব।
- তহবিল পরিচালনা: সদস্য চাঁদা বা অনুদান কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যয় হবে।
পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব ও মেয়াদ
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পরিচালনার জন্য সাধারণত একটি কার্যনির্বাহী কমিটি (Executive Committee) থাকে।
- মেয়াদ: সাধারণত ২ থেকে ৩ বছরের জন্য কমিটি গঠিত হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হয়।
- সভা: মাসে অন্তত একটি মাসিক সভা এবং বছরে একটি বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) করা বাধ্যতামূলক।
- স্বচ্ছতা: সকল সভার রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী খাতায় লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট
একটি অলাভজনক সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা।
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট: সংগঠনের নিজস্ব নামে একটি যৌথ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। সাধারণত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষের মধ্যে যেকোনো দুজনের স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করা যায়।
- অডিট: প্রতি বছর সরকার অনুমোদিত কোনো সিএ ফার্ম বা অডিট প্রতিষ্ঠান দিয়ে সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে।
- ট্যাক্স বা ভ্যাট: সংগঠনের নিজস্ব টিন (TIN) সার্টিফিকেট থাকতে হবে এবং প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
১. একটি সংগঠন করতে ন্যূনতম কতজন সদস্য লাগে?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, একটি সংগঠনের সাধারণ পরিষদে সাধারণত অন্তত ২১ থেকে ৩০ জন সদস্য থাকতে হয়। তবে কার্যনির্বাহী কমিটি সাধারণত ৭, ৯ বা ১১ সদস্য বিশিষ্ট হয়ে থাকে।
২. অনলাইন বা ফেসবুক গ্রুপ কি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে গণ্য হবে?
না, শুধুমাত্র ফেসবুক গ্রুপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইনিভাবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা আইনি ভিত্তি পেতে হলে অবশ্যই সমাজসেবা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিবন্ধিত হতে হবে।
৩. সংগঠনের টাকা কি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যায়?
একেবারেই না। সংগঠনের ফান্ড শুধুমাত্র সংগঠনের গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত জনকল্যাণমূলক কাজেই ব্যয় করতে হবে। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সংগঠনের জন্য নতুন নিয়মাবলী
বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশে সংগঠনের কার্যক্রম আরও সহজ করতে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:
- অনলাইন রিপোর্টিং: এখন অনেক নিবন্ধন দপ্তরে বার্ষিক প্রতিবেদন অনলাইনে জমা দিতে হয়।
- ডিজিটাল রেকর্ড: সংগঠনের সকল তথ্য, সদস্য তালিকা এবং রেজুলেশন ক্লাউড স্টোরেজে (যেমন: Google Drive) ব্যাকআপ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
- সোশ্যাল মিডিয়া পলিসি: সংগঠনের নামে ভুল তথ্য ছড়ানো রোধ করতে একটি নির্দিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া গাইডলাইন থাকা উচিত।
শেষকথা
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পরিচালনা করা যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বের। সঠিক নীতিমালা ও নিয়মাবলী মেনে চললে সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে এবং মানুষের সেবা করা সহজ হয়। নিবন্ধনের আগে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নেওয়া এবং একটি শক্তিশালী গঠনতন্ত্র তৈরি করাই হবে আপনার প্রথম পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: সমাজসেবা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সরকার।