আপনি কি সদ্য কোনো আহবায়ক কমিটির সদস্য সচিব মনোনীত হয়েছেন? অথবা আপনার ক্লাবের এই পদটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইছেন? যদি আপনার মূল প্রশ্ন হয় সদস্য সচিব এর কাজ কি, তবে তার সহজ ও এক কথায় উত্তর হলো:
সদস্য সচিব (Member Secretary) হলেন কোনো আহবায়ক কমিটি বা বিশেষ কমিটির প্রধান নির্বাহী। তাঁর মূল কাজ হলো কমিটির আহবায়কের সাথে পরামর্শ করে সভা আহ্বান করা, সভার কার্যবিবরণী (রেজুলেশন) লেখা, দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলন বা নির্বাচন আয়োজন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করা।
মূলত, আহবায়ক যদি হন “চেয়ারম্যান”, তবে সদস্য সচিব হলেন সেই কমিটির “সিইও” বা কার্যনির্বাহী প্রধান। নিচে এই পদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সদস্য সচিবের প্রধান কাজ ও দায়িত্বসমূহ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, মসজিদ কমিটি বা বিভিন্ন ক্লাবের “আহবায়ক কমিটিতে” এই পদটি থাকে। কাজের সুবিধার্থে একজন সদস্য সচিবের কাজকে আমরা ৩টি প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি:
১. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ (Executive Duties)
সংগঠনের চাকা সচল রাখার মূল দায়িত্ব সদস্য সচিবের কাঁধেই থাকে।
- সভা আহ্বান: আহবায়কের অনুমতি সাপেক্ষে কার্যকরী কমিটি বা সাধারণ সভার তারিখ ও সময় ঠিক করা এবং সদস্যদের কাছে নোটিশ বা চিঠি পাঠানো।
- রেজুলেশন লেখা: মিটিংয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা রেজুলেশন খাতায় লিপিবদ্ধ করা এবং তাতে স্বাক্ষর করে সংরক্ষণ করা। এটি আইনি ও সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
- যোগাযোগ রক্ষা: কেন্দ্রের সাথে স্থানীয় ইউনিটের বা সদস্যদের সাথে কমিটির যোগাযোগ সেতু হিসেবে কাজ করা।
২. সম্মেলন ও নির্বাচন প্রস্তুতি (Conference Prep)
সদস্য সচিব পদটি সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন বা অ্যাডহক কমিটিতে থাকে, তাই তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি তৈরি করা।
- সদস্য সংগ্রহ: নতুন সদস্য ফরম বিতরণ ও সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
- ভোটার তালিকা প্রণয়ন: সম্মেলনের জন্য খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বা কাউন্সিলর তালিকা প্রস্তুত করা।
- কাউন্সিল আয়োজন: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (যেমন ৯০ দিন) সম্মেলনের আয়োজন করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে সহায়তা করা।
৩. আর্থিক ব্যবস্থাপনা (Financial Role)
বেশিরভাগ সংগঠনে আহবায়ক এবং সদস্য সচিবের যৌথ স্বাক্ষরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়।
- আয়-ব্যয়ের হিসাব: সংগঠনের খরচের ভাউচার সংরক্ষণ করা এবং অডিট কমিটির কাছে হিসাব দাখিল করা।
- তহবিল সংগ্রহ: বিভিন্ন ইভেন্ট বা সম্মেলনের জন্য ফান্ড রাইজিং বা চাঁদা আদায়ে নেতৃত্ব দেওয়া।
সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে পার্থক্য কি?
এই প্রশ্নটি অনেকেই করেন। যদিও কাজের ধরন প্রায় একই, তবুও কাঠামোগত কিছু পার্থক্য রয়েছে।
| বিষয় | সাধারণ সম্পাদক (General Secretary) | সদস্য সচিব (Member Secretary) |
| কমিটির ধরন | পূর্ণাঙ্গ বা নির্বাচিত কমিটি (Regular Committee)। | আহবায়ক বা প্রস্তুতি কমিটি (Ad-hoc Committee)। |
| মেয়াদ | দীর্ঘমেয়াদী (২-৩ বছর)। | স্বল্পমেয়াদী (৩ মাস – ১ বছর)। |
| প্রধান কাজ | সংগঠন পরিচালনা ও নীতি বাস্তবায়ন। | দ্রুত সম্মেলন বা নির্বাচন আয়োজন করা। |
| ক্ষমতা | গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী। | নির্দিষ্ট টাস্ক বা দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ। |
একজন সফল সদস্য সচিব হওয়ার কৌশল
অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, এই পদে সফল হতে হলে আপনাকে তিনটি বিষয়ে দক্ষ হতে হবে:
- স্মার্ট ড্রাফটিং: নোটিশ এবং রেজুলেশন লেখার ভাষা হতে হবে প্রাঞ্জল ও নির্ভুল। দাপ্তরিক কাজে আপনাকে পাকা হতে হবে।
- ভারসাম্য রক্ষা: আহবায়ক কমিটির সময় দলে গ্রুপিং বা কোন্দল বেশি থাকে। সদস্য সচিবকে নিরপেক্ষ থেকে সবার সাথে সমন্বয় করতে হয়।
- সময় সচেতনতা: যেহেতু এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের দায়িত্ব, তাই কাজ ফেলে না রেখে দ্রুত শেষ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. আহবায়ক বড় নাকি সদস্য সচিব বড়?
সাংগঠনিক প্রটোকল বা মর্যাদরে দিক থেকে আহবায়ক (Convener) সবার উপরে। তিনি কমিটির প্রধান। সদস্য সচিব তার পরেই অবস্থান করেন। তবে কার্যকরী বা দাপ্তরিক ক্ষমতায় সদস্য সচিবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আহবায়ক সভাপতিত্ব করেন, আর সদস্য সচিব তা পরিচালনা করেন।
২. সদস্য সচিব কি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
না। আহবায়ক কমিটিতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আহবায়কের সম্মতি এবং কমিটির মিটিংয়ে পাস হতে হয়। সদস্য সচিব এককভাবে কাউকে বহিষ্কার বা অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন না, যদি না তাকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
৩. সদস্য সচিবের অনুপস্থিতিতে কে দায়িত্ব পালন করেন?
সাধারণত কমিটিতে একাধিক “যুগ্ম আহবায়ক” থাকেন, কিন্তু “যুগ্ম সদস্য সচিব” পদটি কম দেখা যায়। তবে যদি “প্রথম সদস্য” বা এমন কেউ থাকেন যাকে আগেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি কাজ করবেন। অন্যথায়, আহবায়ক কমিটির সভার মাধ্যমে কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিতে পারেন।
শেষকথা
পরিশেষে, সদস্য সচিবের কাজ হলো একটি সংগঠনকে ক্রান্তিকাল থেকে বের করে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। এটি অত্যন্ত সম্মানের এবং একই সাথে চ্যালেঞ্জিং একটি পদ। আপনি যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন, তবে ভবিষ্যতে সংগঠনের উচ্চতর পদে যাওয়ার পথ সুগম হয়।
আমি মারুফ, গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্র্যান্ডিং এবং কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করছি। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি কিভাবে একটি ছোট স্লোগান একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।