বাংলাদেশে নতুন বাইকের উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমানে পুরাতন বা সেকেন্ড হ্যান্ড বাইকের চাহিদা ব্যাপক। তবে একটি পুরাতন বাইক কেনার আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হতে পারে যদি আপনি সঠিক কাগজপত্র বুঝে না নেন। আইনি জটিলতা এড়াতে এবং মালিকানা পরিবর্তনের জন্য কোন কোন নথিপত্র অত্যাবশ্যক, তা জানা প্রতিটি ক্রেতার জন্য জরুরি। আজকের গাইডে আমরা ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী পুরাতন বাইক কেনাবেচার কাগজপত্রের বিস্তারিত আলোচনা করবো।
পুরাতন বাইক কিনতে কি কি কাগজ লাগে?
পুরাতন বাইক কিনতে মূলত ৫টি প্রধান কাগজ লাগে:
১. বাইকের মূল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (ব্লু-বুক)
২. আপডেট ট্যাক্স টোকেন, ৩. বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ছবি
৪. বিক্রয় হলফনামা (Affidavit)
৫. পূরণকৃত মালিকানা বদলি ফরম (T.O ও T.T.O)।
এই কাগজগুলো ছাড়া বাইক কেনা আইনত ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরবর্তীতে নিজের নামে মালিকানা পরিবর্তন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পুরাতন বাইক কেনার আগে যে কাগজপত্রগুলো চেক করবেন
বাইকের টাকা পরিশোধ করার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে নিচের নথিপত্রগুলো অবশ্যই সংগ্রহ করুন:
১. রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা ব্লু-বুক (Original)
এটি বাইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট হলে কার্ডটি অরিজিনাল কি না যাচাই করুন। কার্ডের চ্যাসিস এবং ইঞ্জিন নম্বরের সাথে বাইকের গায়ে খোদাই করা নম্বর মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক।
২. আপডেট ট্যাক্স টোকেন (Tax Token)
বাংলাদেশে বাইক চালানোর জন্য ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন। যদি ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তবে সেই বকেয়া টাকা এবং জরিমানা কে পরিশোধ করবে (ক্রেতা না বিক্রেতা), তা আগেই আলোচনা করে নিন।
৩. মালিকানা বদলি ফরম (T.O এবং T.T.O)
BRTA-এর নিয়ম অনুযায়ী মালিকানা হস্তান্তরের জন্য দুটি ফরম লাগে:
- ফরম T.O (Transfer of Ownership): এখানে ক্রেতা হিসেবে আপনার তথ্য থাকবে।
- ফরম T.T.O (Transfer Token of Ownership): এখানে বিক্রেতা স্বাক্ষর করবেন যে তিনি মালিকানা হস্তান্তর করছেন।
৪. বিক্রয় হলফনামা (Sale Affidavit)
নটারি পাবলিকের মাধ্যমে ২০০ বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি বিক্রয় হলফনামা তৈরি করতে হয়। এতে উল্লেখ থাকে যে, নির্দিষ্ট তারিখ থেকে বাইকের সকল দায়-দায়িত্ব ক্রেতার। এটি আইনি সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ক্রেতার যা যা লাগবে
আপনি যখন বাইকটি নিজের নামে করবেন (BRTA-তে), তখন আপনার নিজেরও কিছু কাগজ লাগবে:
- আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর ফটোকপি।
- সদ্য তোলা ৩-৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ (বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের কপি)।
- টিন (TIN) সার্টিফিকেট (যদি থাকে, বড় সিসির বাইকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে)।
কিভাবে বুঝবেন বাইকের কাগজ আসল না নকল?
২০২৬ সালে জালিয়াতি রোধে BRTA এখন অনলাইন ভেরিফিকেশন অনেক সহজ করেছে।
- BRTA Service Portal (BSP): পোর্টালে গিয়ে বাইকের নম্বর দিয়ে সহজেই মালিকের নাম এবং ট্যাক্স স্ট্যাটাস চেক করা যায়।
- DL/RC Checker App: এই অ্যাপের মাধ্যমে স্মার্ট কার্ডের কিউআর কোড স্ক্যান করে তথ্য যাচাই করুন।
- ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর: কাগজের নম্বরের সাথে বাইকের মেটাল পার্টে থাকা নম্বর হুবহু মিলতে হবে। কোনো ঘষাঘষি বা কাটাকাটি দেখলে সেই বাইক কেনা থেকে বিরত থাকুন।
পুরাতন বাইক কেনা নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: মালিকানা পরিবর্তন না করে কি পুরাতন বাইক চালানো যায়?
উত্তর: আইনত এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বাইক কেনার পর দ্রুত মালিকানা পরিবর্তন করা উচিত। অন্যথায় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আগের মালিক বা আপনি আইনি বিপদে পড়তে পারেন।
প্রশ্ন: বাইকের মালিক মারা গেলে কি কেনা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে প্রক্রিয়াটি জটিল। সেক্ষেত্রে মৃত মালিকের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ‘উত্তরাধিকার সনদ’ এবং সবার অনাপত্তি নিয়ে বাইক কিনতে হবে।
প্রশ্ন: মালিকানা বদলি করতে কত টাকা খরচ হয় (২০২৬)?
উত্তর: সিসি ভেদে খরচ ভিন্ন হয়। সাধারণত ১০০ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত বাইকের মালিকানা বদলি ফি ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে (ব্যাংক ড্রাফটসহ)।
সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক কেনার সময় বাড়তি সতর্কতা
- আগের লোন: বাইকটি ব্যাংক লোনে কেনা কি না তা নিশ্চিত হোন। লোন থাকলে ‘দায়মুক্তি পত্র’ (NOC) ছাড়া মালিকানা বদলি হবে না।
- ট্রাফিক কেস: বাইকের ওপর কোনো ট্রাফিক মামলা (Case) পেন্ডিং আছে কি না চেক করুন।
শেষকথা
পুরাতন বাইক কেনা সাশ্রয়ী হতে পারে, যদি আপনি সঠিক কাগজপত্রের বিষয়ে সচেতন থাকেন। সবসময় চেষ্টা করবেন সরাসরি মালিকের কাছ থেকে বাইক কিনতে এবং দালালের মাধ্যমে কাজ না করে নিজে BRTA-তে গিয়ে ফি জমা দিতে। এতে আপনার টাকা ও সময় দুই-ই বাঁচবে।
ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলটি তৈরি করেছে আমাদের টেকনিক্যাল টিম, যারা বাংলাদেশের যানবাহন আইন ও BRTA-এর নিয়মিত আপডেট নিয়ে কাজ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো আপনাকে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রতারণা থেকে রক্ষা করা।