ডিভোর্স দিতে কি কি কাগজ লাগে? তালাকের আইনি নিয়ম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ২০২৬

পারিবারিক জীবনে নানা টানাপোড়েনের কারণে অনেক সময় বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে ডিভোর্স বা তালাক শুধুমাত্র একটি মৌখিক ঘোষণা নয়, এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (১৯৬১) অনুযায়ী, ডিভোর্স কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নথিপত্র এবং পদ্ধতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আজকের ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় জানবো ডিভোর্স বা তালাকের জন্য আপনার কোন কোন কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।

ডিভোর্স দিতে কি কি কাগজ লাগে?

বাংলাদেশে ডিভোর্স বা তালাক প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রধানত ৩টি কাগজ লাগে:

১. মূল কাবিননামার (নিকাহনামা) সত্যায়িত কপি

২. স্বামী ও স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনের কপি

৩. তালাকের আইনি নোটিশের অনুলিপি।

এছাড়া পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং অন্তত দুইজন সাক্ষীর তথ্য প্রয়োজন হয়। এই কাগজগুলো নিয়ে একজন নিবন্ধিত কাজি বা আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠাতে হয়।

ডিভোর্স বা তালাকের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আইনি জটিলতা এড়াতে এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করতে নিচের নথিপত্রগুলো সংগ্রহে রাখুন:

১. মূল কাবিননামা (Marriage Deed)

তালাকের আবেদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো কাবিননামা। এতে বিবাহের তারিখ, দেনমোহরের পরিমাণ এবং স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা (তালাক-ই-তফউইজ) দেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ থাকে। যদি মূল কপি না থাকে, তবে যে কাজি অফিসে বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখান থেকে ‘সার্টিফাইড কপি’ তুলে নিতে হবে।

২. স্বামী ও স্ত্রীর পরিচয়পত্র (NID)

উভয় পক্ষের সঠিক নাম, ঠিকানা এবং পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য এনআইডি (National ID) কার্ডের ফটোকপি প্রয়োজন। যদি এনআইডি না থাকে, তবে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন বা পাসপোর্টের কপি ব্যবহার করা যেতে পারে।

৩. পাসপোর্ট সাইজের ছবি

আবেদনকারী এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপর পক্ষের সদ্য তোলা ২-৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি প্রয়োজন হয়।

৪. সাক্ষীদের তথ্য

তালাক কার্যকরের সময় সাধারণত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষীর নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। তাদের পরিচয়পত্রের কপি সাথে রাখা ভালো।

তালাক দেওয়ার সঠিক আইনি প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে ডিভোর্স কার্যকর হতে নোটিশ পাঠানোর পর সাধারণত ৯০ দিন সময় লাগে। পদ্ধতিটি নিচে দেওয়া হলো:

  1. নোটিশ তৈরি: একজন দক্ষ আইনজীবী বা কাজির মাধ্যমে লিখিত তালাকের নোটিশ তৈরি করুন।
  2. নোটিশ পাঠানো: এই নোটিশের একটি কপি অপর পক্ষকে (স্বামী বা স্ত্রীকে) এবং একটি কপি সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠাতে হবে।
  3. আপস প্রচেষ্টা: চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে একটি সালিশি বোর্ড গঠন করবেন উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করানোর জন্য।
  4. কার্যকর হওয়া: যদি সমঝোতা না হয়, তবে নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিন পর তালাকটি আইনগতভাবে কার্যকর হবে।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন: কাবিননামা হারিয়ে গেলে কি ডিভোর্স দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যাবে। সংশ্লিষ্ট কাজি অফিস বা জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে কাবিননামার নকল বা সার্টিফাইড কপি তুলে নিয়ে আপনি ডিভোর্স প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।

প্রশ্ন: ডিভোর্স দিতে কত টাকা খরচ হয় (২০২৬)?

উত্তর: সরকারি ফি অনুযায়ী তালাক রেজিস্ট্রেশনের একটি নির্দিষ্ট খরচ আছে। তবে আইনজীবী বা কাজির ফি এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকার মধ্যে প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।

প্রশ্ন: স্ত্রী কি স্বামীকে তালাক দিতে পারেন?

উত্তর: যদি কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা (তালাক-ই-তফউইজ) দেওয়া থাকে, তবে স্ত্রী একইভাবে নোটিশ পাঠিয়ে তালাক দিতে পারবেন। অন্যথায় তাকে ‘খুলা তালাক’ বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ (ডিজোলিউশন অফ মুসলিম ম্যারেজ অ্যাক্ট) চাইতে হবে।

তালাক পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ডিভোর্স হয়ে গেলেও স্বামীর ওপর দুটি প্রধান দায়বদ্ধতা থাকে:

  • দেনমোহর: যদি বিয়ের সময় দেনমোহর পরিশোধ করা না হয়ে থাকে, তবে তালাকের পর স্ত্রীকে পুরো টাকা পরিশোধ করতে হবে।
  • ইদ্দতকালীন খোরপোশ: তালাক কার্যকর হওয়ার সময় পর্যন্ত (সাধারণত ৩ মাস ১০ দিন) স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীকেই দিতে হবে।

শেষকথা

ডিভোর্স বা তালাক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় হলেও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সঠিক কাগজপত্র থাকা অপরিহার্য। ভুল পদ্ধতিতে তালাক দিলে পরবর্তীতে দেনমোহর বা সন্তানের কাস্টডি নিয়ে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ পারিবারিক আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সতর্কীকরণ: এই নিবন্ধটি কেবলমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার জন্য একজন নিবন্ধিত আইনজীবীর সরাসরি পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

Leave a Comment