এক আবেদনেই ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসা নিবন্ধন

আপনি কি নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছেন? ব্যবসার আইডিয়া চমৎকার হলেও সরকারি দপ্তরের আইনি জটিলতা, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রিতা এবং দপ্তরে দপ্তরে ঘোরার ভয়ে অনেকেই পিছিয়ে যান। আগে একটি ব্যবসার জন্য নামের ছাড়পত্র, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, টিআইএন এবং ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আলাদা আলাদা অফিসে দৌড়াতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই চিত্র এখন বদলে গেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) নিয়ে এসেছে যুগান্তকারী ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ (OSS)। এখন ঘরে বসেই একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আপনি ব্যবসার সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানবো, কীভাবে বিডা ওএসএস (BIDA OSS) ব্যবহার করে খুব সহজে এবং দ্রুত আপনার ব্যবসার নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন।

বিডা ওয়ান স্টপ সার্ভিস (OSS) কী?

সহজ কথায়, বিডা ওএসএস বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস হলো এমন একটি ডিজিটাল সেবা বা ‘ডিজিটাল দরজা’, যেখানে একজন উদ্যোক্তা একটি মাত্র আবেদনের মাধ্যমে ব্যবসার প্রয়োজনীয় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন পেতে পারেন। আগে যেখানে প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা সময় ও অর্থ খরচ হতো, এখন তা এক ক্লিকেই সম্ভব।

সনাতন পদ্ধতি বনাম ওএসএস

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রথাগত পদ্ধতিতে সরকারি দপ্তরে গিয়ে কাজ করতে দিনের পর দিন সময় নষ্ট হয়। ওএসএস ব্যবহারের প্রধান সুবিধাগুলো হলো:

  • ওয়ান স্টপ সলিউশন: নামের ছাড়পত্র থেকে ট্রেড লাইসেন্স—সব এক জায়গায়।
  • সময় ও খরচ সাশ্রয়: আলাদা দপ্তরে যাওয়ার বা বাড়তি যাতায়াত ভাড়ার প্রয়োজন নেই।
  • ভুলের সুযোগ কম: একবার তথ্য দিলে তা সব ফর্মে অটোমেটিক বসে যায়, তাই বারবার লেখার ঝামেলা নেই।
  • স্বচ্ছতা: ড্যাশবোর্ডে আবেদনের বর্তমান অবস্থা বা স্ট্যাটাস নিজেই দেখা যায়।

বিডা ওএসএস-এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া

আপনার ব্যবসার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন। অনলাইনের বিভিন্ন তথ্য মতে, প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

১. অ্যাকাউন্ট তৈরি ও সাইন-আপ

প্রথমে বিডা ওএসএস পোর্টালে গিয়ে সাইন-আপ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে:

  • উদ্যোক্তার নাম ও জন্ম তারিখ
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর
  • প্রতিষ্ঠানের ধরন ও ঠিকানা

এই তথ্যগুলো দিয়ে সাইন-আপ করলেই আপনার জন্য একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি হবে।

২. ব্যবসার তথ্য যাচাইকরণ

লগইন করার পর ড্যাশবোর্ডে আপনাকে ব্যবসার বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। যেমন: কোম্পানির নাম, ব্যবসার খাত ও উপখাত, এবং পণ্য বা সেবার বিবরণ। এই তথ্যগুলো সাবমিট করার পর বিডার কর্মকর্তারা সাধারণত ১ ঘণ্টার মধ্যে তথ্য যাচাই করে অনুমোদন দেন।

৩. মাল্টিপল লাইসেন্স মেনু (আসল ম্যাজিক)

তথ্য অনুমোদনের পর ড্যাশবোর্ডের ‘মাল্টিপল লাইসেন্স’ মেনু থেকে আপনি মূল প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। এখানে একটি আবেদনেই নিচের ৫টি কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায়:

  1. নামের ছাড়পত্র (Name Clearance): আরজেএসসি (RJSC)-এর অটোমেটেড সার্চের মাধ্যমে আপনার কোম্পানির নাম যাচাই করা হয়।
  2. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: কর্পোরেট ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এখান থেকেই সম্পন্ন হয়।
  3. কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন: ব্যাংক হিসাব অনুমোদনের পর পরিচালকদের তথ্য দিয়ে কোম্পানি নিবন্ধন করা যায়।
  4. ই-টিন (E-TIN): স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার কোম্পানির জন্য কর্পোরেট টিআইএন তৈরি হয়ে যাবে।
  5. ট্রেড লাইসেন্স: সবশেষে অনলাইনে ফি পরিশোধ করে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যায়।

প্রো টিপ: সিস্টেমে আপনার আগের দেওয়া তথ্যগুলো অটোমেটিক নিয়ে নেয়, তাই বারবার তথ্য লেখার ঝামেলা বা ভুলের সম্ভাবনা থাকে না।

আবেদন ট্র্যাকিং ও সনদ সংগ্রহ

আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনি ড্যাশবোর্ড থেকে এর সর্বশেষ অবস্থা দেখতে পারবেন। যদি কোনো তথ্যে ভুল থাকে, তবে দ্রুত সংশোধনের নোটিফিকেশন আসবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হলে, আপনার প্রয়োজনীয় সব সনদ বা সার্টিফিকেট এক জায়গা থেকেই ডাউনলোড করতে পারবেন।

ব্যবসায়িক সুবিধা

এই ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা শুধু সময় বাঁচায় না, এটি আপনার ব্যবসার বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ায়। সঠিক নিবন্ধনের ফলে:

  • আর্থিক সুবিধা: ব্যাংক ঋণ বা লোন পাওয়া সহজ হয়।
  • বিনিয়োগ: বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।
  • গ্লোবাল রিচ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নেওয়া যায়।
  • সুরক্ষা: ব্যবসার আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: বিডা ওএসএস-এ নিবন্ধন করতে কত সময় লাগে?

উত্তর: বিডা কর্মকর্তারা সাধারণত ১ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য যাচাই করেন। এরপর ধাপে ধাপে বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

প্রশ্ন: ট্রেড লাইসেন্স ফি কি অনলাইনে দেওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন ও ফি পরিশোধ পুরোটাই অনলাইনে করা সম্ভব।

শেষ কথা

বাংলাদেশে একটি উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিডা (BIDA)-এর এই ওয়ান স্টপ সেবা নতুনদের জন্য আত্মবিশ্বাস ও গতির নতুন পথ তৈরি করছে। ব্যবসা শুরু করা এখন আর কোনো জটিল প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ডিজিটাল অভিজ্ঞতা। তাই আর দেরি না করে আজই আপনার স্বপ্নের উদ্যোগকে আইনি রূপ দিন।

Leave a Comment