মসজিদ কমিটি গঠনের রেজুলেশন লেখার নিয়ম

একটি মসজিদ পরিচালনার জন্য বৈধ কমিটি গঠন এবং তার লিখিত প্রমাণ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই জানেন না কীভাবে একটি পরিপূর্ণ রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী লিখতে হয় যা আইনি ও দাপ্তরিক কাজে গ্রহণযোগ্য। আজকের এই গাইডে আমরা একটি আদর্শ রেজুলেশন লেখার ধাপে ধাপে নিয়ম আলোচনা করব।

রেজুলেশন লেখার মূল কাঠামো (Step-by-Step)

ভিডিওর নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি নির্ভুল রেজুলেশন লিখতে হলে খাতার পাতাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করতে হয়। নিচে প্রতিটি অংশের বিবরণ দেওয়া হলো:

১. সভার প্রাথমিক তথ্য: রেজুলেশন খাতার ঠিক ওপরে মাঝখানে বড় করে “রেজুলেশন” বা “কার্যবিবরণী” লিখতে হবে। এরপর বাম পাশে এবং নিচে নিচের তথ্যগুলো ধারাবাহিকভাবে দিতে হবে:

  • সভা নং: (কত তম সভা, যেমন: ০১/২০২৫)
  • স্থান: (যেখানে সভাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেমন: মসজিদ চত্বর/অফিস কক্ষ)
  • সময়: (কখন শুরু হয়েছে, যেমন: বাদ আসর/সকাল ১০টা)
  • তারিখ: (সভার দিন ও তারিখ)

২. উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষর: সভার তথ্যের ঠিক নিচেই “উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষর” শিরোনামে একটি তালিকা করতে হবে। সেখানে ১, ২, ৩ ক্রমিক নম্বর দিয়ে সভায় উপস্থিত সকলের নাম ও স্বাক্ষর গ্রহণ করতে হবে। এটি কমিটির বৈধতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

৩. সভার সূচনা বক্তব্য: স্বাক্ষর অংশের পর মূল বডি শুরু হবে। এখানে প্রথাগত ভাষায় লিখতে হবে। যেমন:

“অদ্য [তারিখ] রোজ [বার], [স্থান]-এ [মসজিদের নাম]-এর এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব [সভাপতির নাম]…”

৪. আলোচ্য বিষয় (Agenda): সভায় কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, তা পয়েন্ট আকারে লিখতে হবে। মসজিদ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এগুলো হতে পারে:

  • বিগত কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া প্রসঙ্গে।
  • নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন প্রসঙ্গে।
  • মসজিদের উন্নয়ন ও বিবিধ।

৫. গৃহীত সিদ্ধান্ত (Decisions): আলোচনা শেষে সবাই মিলে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন, তা “গৃহীত সিদ্ধান্ত” শিরোনামে লিখতে হবে। এখানেই নতুন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও ক্যাশিয়ারের নাম প্রস্তাব ও অনুমোদন করা হয়।

৬. সভার সমাপ্তি ও চূড়ান্ত স্বাক্ষর: সবশেষে সভাপতি কর্তৃক সভার সমাপ্তি ঘোষণা করে খাতার নিচের অংশে ডানপাশে সভাপতির স্বাক্ষর এবং বামপাশে সাধারণ সদস্য বা সম্পাদকের স্বাক্ষর থাকবে।

নমুনা রেজুলেশন (Sample Format for Masjid Committee)

নিচে আপনার সুবিধার জন্য একটি মসজিদ কমিটি গঠনের রেজুলেশন ড্রাফট দেওয়া হলো। এটি কপি করে আপনার প্রয়োজনমতো নাম ও স্থান বসিয়ে নিন।

[মসজিদের নাম] জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটি সভার কার্যবিবরণী বা রেজুলেশন

সভা নং: ০১/২০২৫

স্থান: [মসজিদের নাম] চত্বর

তারিখ: ২০/১০/২০২৫ ইং

সময়: বাদ আসর (বিকাল ৪:৩০ ঘটিকা)

উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষর: ১. (নাম ও স্বাক্ষর) ২. (নাম ও স্বাক্ষর) ৩. (নাম ও স্বাক্ষর) (ধারাবাহিকভাবে সকল উপস্থিত মুসল্লি/সদস্যের স্বাক্ষর)

বিবরণ: অদ্য ২০/১০/২০২৫ ইং তারিখ, রোজ সোমবার, [মসজিদের নাম] প্রাঙ্গণে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে জনাব [সভাপতির নাম]-কে সভাপতির আসন গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। তিনি আসন গ্রহণ করে সভার কাজ শুরু করেন। সভায় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের পর নিম্নলিখিত এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সভার আলোচ্য বিষয়সমূহ: ১. পুরাতন কমিটি বিলুপ্তকরণ। ২. নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন। ৩. বিবিধ।

গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ: সভায় উপস্থিত সকলের বিস্তারিত আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়:

  • সিদ্ধান্ত-১: যেহেতু পুরাতন কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাই সর্বসম্মতিক্রমে পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।
  • সিদ্ধান্ত-২: আগামী ২ (দুই) বছরের জন্য মসজিদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করা হলো:
    • সভাপতি: জনাব [নাম]
    • সাধারণ সম্পাদক: জনাব [নাম]
    • ক্যাশিয়ার: জনাব [নাম]
    • (অন্যান্য পদের নাম ও নির্বাচিত ব্যক্তির নাম)
  • সিদ্ধান্ত-৩: নতুন কমিটি আজ থেকেই তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন এবং মসজিদের ব্যাংক হিসাব এখন থেকে নতুন সভাপতি ও সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে।

সভার সমাপ্তি: আর কোনো আলোচ্য বিষয় না থাকায় সভাপতি মহোদয় উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

(স্বাক্ষর) সাধারণ সদস্যদের পক্ষে (পদবী বা নাম) তারিখ: ২০/১০/২০২৫

(স্বাক্ষর) সভাপতি [মসজিদের নাম] পরিচালনা কমিটি তারিখ: ২০/১০/২০২৫

জরুরি টিপস

  • কাটাকাটি করবেন না: রেজুলেশন খাতায় ঘষামাজা বা ফ্লুইড ব্যবহার করলে আইনি জটিলতা হতে পারে। ভুল হলে এক টানে কেটে পাশে ছোট করে স্বাক্ষর দিন।
  • স্বাক্ষরের অবস্থান: ভিডিওর নির্দেশনামতে, খাতার একদম নিচে ডানদিকে সভাপতির স্বাক্ষর এবং বামদিকে অন্যান্য সদস্য বা সম্পাদকের স্বাক্ষর রাখা দাপ্তরিক শিষ্টাচার।
  • ভাষা: ভাষা হতে হবে সাধু ও চলিত রীতির মিশ্রণমুক্ত এবং অত্যন্ত স্পষ্ট।

এই ফরম্যাটটি অনুসরণ করলে আপনার মসজিদ কমিটির রেজুলেশনটি হবে সম্পূর্ণ প্রফেশনাল এবং ভবিষ্যতে যে কোনো দাপ্তরিক বা ব্যাংকিং কাজে (যেমন অ্যাকাউন্ট খোলা) এটি নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top